মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

খাদ্য উৎপাদন

গোলাপ চাষঃ প্রাকৃতিক সপ্তমাশ্চর্যের নৈসর্গিক নিদর্শন কক্সবাজার। চট্টগ্রাম থেকে আসতে তারি প্রবেশদ্বারে পাহাড়ের সুবজে ভরা গ্রামটির নাম বরইতলী। বাংলার রূপ মাধুর্যের অপূর্ব মিলন মেলা। চতুর্দিকে পাহাড় বেষ্টিত সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা সুন্দর একটি জনপদ। বড়ই উর্বর এই জনপদের মাটি। কবির ভাষায়- ‘‘ওভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি.......আমার দেশের মাটি’’। কবির মা-মাটি ও মানুষের মর্মস্পর্শী টানের ছোঁয়া এখানেই খুঁজে পাওয়া যায়। বিগত দুই দশকে এই জনপদেই বাণিজ্যিক ফুল চাষের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব। এলাকার শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার যুবকেরা খুঁজে পেয়েছে তাদের আত্ম কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে এখানে চাষ হচ্ছে গোলাপ, গ্লাাডিওলার্স, গাঁদা রজনীগন্ধা সহ বিভিন্ন জাতের বাহারী ফুল। বরইতলী ইউনিয়নের উপর দিয়ে একে বেঁকে চলে যাওয়া আরকান মহাসড়কের উভয় পাশে এবং যে নদী সোনা ফলায় সেই সোনাইছড়ির দুই তীরে বিভিন্ন বাগানে সোভা পাচ্ছে এ সব ফুল। দুর দুরান্ত থেকে ছুটে আসে ফুল প্রেমিক ও পর্যটকরা। আজ বরইতলী কক্সবাজার বাসীর গর্ব।

বাণিজ্যিক যাত্রা: চট্টগ্রাম শহরের বিশিষ্ট দমত্ম চিকিৎসক ডাঃ মোহাম্মদ মুসা সাহেব, (স্থায়ী নিবাস, হাটহাজারী উপজেলায়) বরইলীতে বেড়াতে এসে এর রূপ মাধুর্যে অভিভূত হন। তিনি তার ২য় পুত্র জনাব মরহুম জাহাঙ্গীর কবিরকে নিয়ে বরইতলীর অনতি দূরে পাহাড়ীয়া জমি ক্রয় করে গড়ে তোলেন বিশাল খামার বাড়ি। খামার বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন জনাব জাহাঙ্গীর কবিরকে। কিন্তু ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে লন্ড ভন্ড হয়ে যায় তার সমসত্ম বাগান বাড়ি। অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। চিমত্মা করতে থাকেন, কি গাছে বা উদ্ভিদে স্বল্প সময়ে ফলন আসে। অনুসন্ধানি মন নিয়ে ঘুরে বেড়ান চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন নার্সারীতে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন খুঁজে পান বাণিজ্যিক গোলাপ চাষের ধারণাটি। তখন সময় ১৯৯৪ সাল। চট্টগ্রাম অলি খাঁ মসজিদ সংলগ্ন, সবুজ বিপ্লব নার্সারীর মালিকের সাথে গোলাপ চাষ পদ্ধতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা হয় জনাব জাহাঙ্গীর কবিরের। তাদের এ আলোচনা থেকেই সৃষ্টি হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগে বাণিজ্যিক গোলাপ চাষের ধারণাটি। সবুজ বিপ্লব নার্সারি থেকে উন্নত জাতের বাড গ্রাফটিং (চোখ কলম) চারা ক্রয় করে তিনি খামার বাড়িতে শুরু করেন বাণিজ্যিক গোলাপ চাষ।

বাগানের পরিকল্পনা :পরিকল্পনা মাফিক বাগানের নক্শা তৈরি সম্বন্ধে কিছু পূর্ব ধারণা থাকা দরকার। অনেকে ভূলক্রটি এড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞের সুপারিশ মত কাজ করেন। যেখানে দিনে অধিকাংশ সময় সরাসরি সূর্যের আলো পায় গোলাপের জন্য তা খুবই সুবিধাজনক। শীতের দিনে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যমত্ম সূর্যের আলো গোলাপকে খুব ভালভাবে বাড়তে সাহায্যে করে। পানি নিকাশের জন্য ক্রমান্বয়ে ঢালু জমি হলে ভাল হয়। সাধারণত উত্তর-দক্ষিণ সারি করে বাগান করলে প্রত্যেক গাছে আলো-বাতাসের সুন্দর ব্যবস্থা হয়।

মাটি:কোনও মাটি অম্ল, ক্ষার বা প্রশম ধর্মী হতে পারে। অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব নির্ধারণের মাপকাঠি হল PH Valueযার বিসত্মার ১-১৪ পর্যমত্ম। PHসাত হলে মাটি প্রশম, সাত এর নিচে অম্ল ও সাত এর উপরে ক্ষার ধর্মী বলে ধরতে হবে।

অম্লত্ব:সাধারণত PH 5.5 এর উপরে মাটির ব্যাক্টেরিয়া সুষ্ঠভাবে বংশ বিসত্মার ও জীবন ধারণ করতে পারে। জীবাণু বা অ্যামোনিয়াকে অনায়াসে নাইট্রেট এ রূপামত্মরিত করতে পারে। নিম্ন PH (১-৫) মাটিতে অ্যালুমুনিয়াম আয়রণ ও ম্যাংগানীজের দ্রবনীয়তা বেড়ে যায়, যা গাছের পক্ষে ক্ষতিকর। মাটির PHবাড়লে ঐ আয়নগুলো অতি অল্প মাত্রায় দ্রবণীয় অবস্থায় আসে। ফলে গাছের অনিষ্ট না হয়ে উপকারে আসে। কপার ও জিংক যা গাছের অল্প মাত্রায় প্রয়োজন হয়, তাও মাটির PH  সাত এর কাছাকাছি থাকলে প্রয়োজনীয় মাত্রায় তা গাছ পেতে পারে। মাটির অম্লত্ব প্রশমনে বিভিন্ন প্রকার চুন, লাইমষ্টুন, ডলুমাইট, ক্যালসিয়াম অক্সাইড, চক ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষে প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম হতে ৭৫০ গ্রাম চুন ব্যবহার করা যায়।

ক্ষারত্ব বা লবণাক্ততা:এমন মাটি গোলাপের পক্ষে অনুপযোগী দ্রবণীয় লবণ বেশী থাকার ফলে মাটিরPHসাধারণত ৮.৫ এর কম হয় না। উৎপন্ন সোডিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড কার্বনডাইঅক্সাইড এর সঙ্গে বিক্রিয়া যোগে সোডিয়াম কার্বনেট এ রূপামত্মরিত হয়। সোডিয়াম কার্বনেট গোলাপের পক্ষে বেশ ক্ষতিকর। কার্বনেট বা বাই কার্বনেট মাটি থেকে দূর করতে জিপসাম বা প্লাষ্টার অব প্যারিস প্রয়োগ অত্যমত্ম কার্যকর। জিপসাম ও সোডিয়াম কার্বনের এর বিক্রিয়ার ফলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ও সোডিয়াম সালফেট তৈরি হয়, কার্বনেট মুক্ত হয়। মূল উদ্দেশ্যে সোডিয়ামকে সরানো। প্রতি শতকের ৪০০-৭৫০ গ্রাম জিপসাম বা ১০০-২৫০ গ্রাম সালফার প্রয়োগ করে মাটিকে পুণরুদ্ধার করা যায়।

উৎপাদন:প্রতি ৪০ শতক (এক কানি) জমিতে প্রতিদিন গড়ে ১ম/২য়/৩য় বৎসর যথাক্রমে ৮০০/১২০০/১২০০ গোলাপ উৎপাদিত হবে। তবে জমির উর্বরতার উপর ভিত্তি করে উৎপাদন কম-বেশি হতে পারে।

বিনিয়োগ: বর্তমানে ৪০ (চল্লিশ শতক) জমিতে প্রায় ১,৪৫,০০০/ (এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার) টাকাবিনিয়োগ করতে হয়। যেমন:

বিনিয়োগের খাত

দর

টাকা

ক) জমির খাজনা (১ম বৎসর)

১৬০০০

১৬০০০

খ) গোলাপের চারা(৩৫০০টি)

১৫

৫২৫০০

গ) সার (রাসায়নিক ও জৈব)

৮০০০

৮০০০

ঘ) গোবর/ কম্পোষ্ট সার (৭.৫টন)

১০০০

৭৫০০

ঙ) ঘিরা-বেড়া

১০০০০

১০০০০

চ) খামার বাড়ি তৈরি

২০০০০

২০০০০

ছ) স্প্রে মেশিন ও সরঞ্জাম

৮০০০

৮০০০

জ) জমি চাষ ও চারা রোপন

৫০০০

৫০০০

ঝ) কর্মচারী বেতন (২ মাস-২জন)

১৬০০০

১৬০০০

ঞ) সেচ ও অন্যান্য

২০০০

২০০০

মোট বিনিয়োগ

১,৪৫,০০০